বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ও সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন হলো শুধু গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেই কি বিদ্যমান আইন বা বিধি পরিবর্তন করা যায়?
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৪০ অনুযায়ী বার কাউন্সিল সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে বিধি প্রণয়ন করতে পারে। সুতরাং বার কাউন্সিলের সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় বিধি সংশোধন করে তা কার্যকর করা এক বিষয় নয়। গণবিজ্ঞপ্তি নিজে থেকেই আইন পরিবর্তনের বিকল্প হতে পারে না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ২০১৭ সালের Civil Appeal মামলার রায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, বার কাউন্সিল বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির বয়সসীমা নির্ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ বয়সসীমা নির্ধারণ একেবারেই অসম্ভব নয়। তবে তা যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় করতে হবে।
অন্যদিকে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ৪০ অনুচ্ছেদ আইনসাপেক্ষে বৈধ পেশা গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। তাই ৩৫ বছরের বেশি বয়সী যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিটির আইনগত ভিত্তি, যৌক্তিকতা ও সাংবিধানিক সামঞ্জস্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
উন্নত বিশ্বের উদাহরণ হিসেবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সলিসিটর হওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। সেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিক মানদণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি দেখায় যে, পেশার মান নিশ্চিত করতে বয়সের পাশাপাশি দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব।
আমার মতে, আইন পেশার মানোন্নয়ন অবশ্যই জরুরি। তবে শুধু বয়সকে যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি না করে মানসম্মত পরীক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত নৈতিকতা ও কার্যকর শৃঙ্খলাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে বলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনসম্মত বা বেআইনি হয়ে যায় না। বয়সসীমা কার্যকরের জন্য প্রয়োজনীয় বিধি সংশোধন, সরকারি পূর্বানুমোদন ও গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
আইনের শাসনের মূলনীতি হলো, ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আইন পেশার মানোন্নয়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই মানোন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপে সাংবিধানিক অধিকার ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখাও অপরিহার্য।